![]() |
স্যামুয়েল কোল্ট,invention of pistol, invention of revolver,পিস্তল আবিষ্কার, রিভলভার আবিষ্কার,বন্দুক আবিষ্কারের কাহিনী,রিভলভার উদ্ভাবন |
বিজ্ঞানী স্যামুয়েল কোল্ট এর রিভলভার উদ্ভাবনের দু:সাহসিক কাহিনী - story of the invention of revolver by Samuel Colt - part 2 of 3
কিন্তু সবাইকে হতবাক করে দিয়ে বোর্ড-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ স্যাম তাদের দেয়নি। সেদিনই গভীর রাত্রে তার তল্পিতল্পা গুটিয়ে সে সবার অলক্ষ্যে বেরিয়ে ওয়েআর-এর দিকে রওয়ানা দিলো। পরদিন ভোরে তার পলায়নের খবর জানাজানি হলে ফ্যাকালটির প্রায় সকল সদস্যই বলতে গেলে এক কথায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। স্যামের উদ্দেশ্য ছিলো মহৎ। তুখোড় ছেলে সে। কিন্তু সে সব সময় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতো। তাই তার সঙ্গে একই দালানে বাস করার অর্থ, একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরির সাথে এক বিছানায় বাস করা!
অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়ি পৌছাবার পর স্যামকে তার বাবার ক্রুদ্ধ তিরস্কারের সম্মুখীন হতে হলো। বাবা ক্রিস্টোফার কোল্ট গর্জে উঠলেন,- “এ দেখার জন্যেই কি আমার এতে ত্যাগ স্বীকার, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা? লেখাপড়া সব বাদ দিয়ে নিজেই-নিজের হোস্টেল-রুমের কোঠা উড়িয়ে দিচ্ছো, কেমন? এজন্যে নিশ্চয় তোমাকে এতো খরচপাতি করে দূরের আবাসিক একাডেমীতে পাঠানো হয়নি। বলো? উত্তর দাও?'
স্যাম খুব নম্র ও বিনীতভাবে বললো, আমি যেসব বিষয় ভালোবাসি তা তারা স্কুলে পড়ান না। আর এখন তারা আমার যন্ত্রপাতি নিয়ে নিয়েছেন। যদি আমি পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ করতেই না পারলাম, তবে আমি আর ওখানে থাকতেও চাইনা। তাছাড়া,-আপনি বৃদ্ধ বয়সে কষ্ট করে শুধু আমার জন্যে ত্যাগ স্বীকার করবেন, এটাও আমি চাইনা বাবা। আমার নিজের পথ বেছে নেবার মতো বয়স এখন নিশ্চয় আমার হয়েছে?
ক্রিস্টোফার তার ছেলেকে সাময়িকভাবে আবার রেশম কারখানায় ফিরে যেতে আদেশ করলেন। স্যামের মেধা সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণভাবে সচেতন ছিলেন। তবে তাঁর স্থির বিশ্বাস,–এখন তার বড়ো প্রয়োজন কঠিন নিয়মশৃঙ্খলার বন্ধন। হয়তো স্যামের সাগরে যাবার মানে, নাবিক হবার ইচ্ছে, এটাও মন্দ নয়। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় সে হয়তো মানুষের মতো মানুষ হয়ে ফিরে আসতে পারে।
এর মাত্র কয়েকদিন পর ক্রিস্টোফার তার বন্ধু ‘বোস্টন'-এর এক শিপিং প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী স্যামুয়েল লরেন্সের কাছে একটি চিঠি দিলেন। অফিসারের কাজে শিক্ষানবিশি হিসেবে স্যামকে মিডশিপম্যান করে নেয়া যায় কি না, তা জানতে চাইলেন তিনি বন্ধুর কাছে।
লরেন্সের উত্তরও খুব তাড়াতাড়ি পাওয়া গেলো। তিনি বন্ধুর চিঠির উত্তরে লিখলেন,
প্রিয় বন্ধু ক্রিস্টোফার,
অনেকদিন পর তোমার চিঠি আমাকে ভীষণ আনন্দ দিয়েছে। তুমি যে এখনো আমার মতো বন্ধুটিকে স্মরণে রেখেছে এতে করে তোমার মনের হৃদ্যতার এবং মানবিক উদারতার প্রকাশ মিলে। বন্ধু, তুমি আমার নববর্ষের শুভেচ্ছা নিও এবং ঈশ্বরের দৃষ্টি তোমার এবং স্যাম-এর প্রতি বর্ষিত হোক এটাই কামনা করি।
এবার তোমার চিঠির উত্তরে বলছি, আগামী সামারে দুই মাস্তুলের একটি বাণিজ্য জাহাজ নাম কার্ভো সেটি বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করবে। জাহাজটি পুরো একটি বছরের জন্য বোস্টন পোতাশ্রয় ত্যাগ করবে, পথে লন্ডন-এর ডান্ডি হয়ে ভারতের কোলকাতা বন্দরে গিয়ে যাত্রা শেষ করবে-ফের যাত্রা আবার একই পথে যথারীতি মূল বন্দর বোস্টনে ফিরবে।
তোমার ছেলে স্যাম-সেতো আমারও ছেলের মতো। ওর জন্যে এই কার্ভো জাহাজেই আমি চাকুরীর ব্যবস্থা করে দিতে পারবো।
আর সত্যি কথা বলতে নাবিক-এর শেকড় এই দেশ নিউ ইংল্যান্ডের কোনো বালকের ভবিষ্যত সৌভাগ্য গড়ার শুরুতে এটা এক রোমাঞ্চিত, বিরাট এবং চমৎকার সুযোগ।
আশা করি স্যাম-এর মতামত নিয়ে যদি তোমরা রাজি থাকো তবে অবশ্যই স্যামকে ১৮৩০-এর জুলাই মাসের মধ্যে বোস্টনে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবে।
তোমাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনায় ঈশ্বরের প্রতি আমার থেকে করজোড় আবেদন ও আমার ঐকান্তিক শুভেচ্ছা
তোমার নিত্য শুভাকাক্ষী
-স্যামুয়েল লরেন্স
বোস্টন, ১৮৩০
১৮৩০ সালের ২রা আগষ্ট, স্যামের ষোড়শতম জন্মদিনের দু'সপ্তাহ পর কার্ভো জাহাজ বোস্টন বন্দর ত্যাগ করে লন্ডন হয়ে কোলকাতার পথে প্রথম পালটি তুলে রওয়ানা হলো। তার খোলের ভিতর ইয়াংকি তুলো আর ডেকের উপর একদঙ্গল মিশনারীর ব্যস্ত চলাফেরা। নাবিকের প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম স্যামকে দেয়া হয়েছে। তার পরনে ছিলো তারপুলিনের তৈরী ডোরাকাটা শার্ট এবং ঠিক একই কাপড়ের ডোরাকাটা পাজামা। তার বাক্স ভর্তি দিগনির্ণয় যন্ত্র, কম্পাস আর পঞ্জিকা, আর পকেটে রয়েছে নতুন চকচকে এক ডলার দামের একটা বড় চাকু।
কার্ভো জাহাজ রওয়ানা হবার ঠিক পূর্বে, সম্মুখভাগের উপরের পালটা খুলে দেবার জন্যে জাহাজের ক্যাপ্টেন স্যামকে মাস্তুলের উপর ওঠার আদেশ দিলেন। তার হাতের উপর দিয়ে ভারি দড়িগুলো গড়িয়ে যাবার সময় স্যাম চেয়ে দেখলো,-পালগুলোতে হাওয়া লেগে ফুলে-ফেঁপে টানটান হয়ে পড়েছে। জাহাজ চলতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারলো, আবার নিউ ইংল্যান্ডের (অ্যামেরিকার) দেখা পেতে তাকে দীর্ঘদিনের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। এখন শুধুই পানির সাথে মিতালী।
এ সমুদ্রযাত্রা স্যামের খুবই পছন্দ হলো, এতো তারই কাঙিক্ষত। সে কল্পনার চোখে নাবিক জীবনের কত রঙিন অভিযানের স্বপ্ন দেখতো আর নিজে সেই জীবনকে অপভরা চোখে কল্পনা করতো। কিন্তু যাত্রার মাত্র ক'দিন পর পরই সপ্তাহ ধরে সাগর ও আকাশ ছাড়া সে আর কিছুই দেখেনি। মন থেকে এই হতাশা তাড়ানোর জন্যে সে স্বেচ্ছায় জাহাজের উপর বিরক্তিকর গতানুগতিক কাজকর্মে ক্রমেই বেশি চঞ্চল হয়ে উঠলো।
কার্ভো জাহাজের ডেকে’র চেয়ে বিল স্মিথের রাসায়নিক ল্যাবরেটরীর ছোটো ঘরটা তার কাছে বেশি রোমাঞ্চকর মনে হতে লাগলো।
মাঝে-মাঝে কোনো ঘুমন্ত বন্দরে জাহাজ কর্মীদের খাদ্য-সামগ্রীর জন্যে সামান্য বিরতি একঘেয়েমির হাত থেকে তাকে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও রক্ষা করতো। কখনো কখনো গ্রীষ্মমন্ডলের ঝড় কয়েক ঘন্টার জন্যে ভীষণ উত্তেজনার সৃষ্টি করতো। তখন জাহাজের প্রতিটি সমর্থ মানুষ তার সহ্যের শেষ সীমায় গিয়ে পৌছতো। তবে স্বভাবত সাগরগুলো ছিল শান্ত। কার্ভো জাহাজের বিটুমিন দেয়া ডেকের উপর প্রথম সূর্যের আলো হুমড়ি দিয়ে পড়তো। সে সময় জাহাজটা দক্ষিণ মুখে উত্তমাশা অন্তরীপের দিকে এগিয়ে চলছিলো। এরপর জাহাজটা ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর পার হয়ে অবশেষে কোলকাতা বন্দরে গিয়ে পৌঁছবে।
খালাসীদের প্রায় সবাই অবসর সময়ে ডেক-এর উপর একত্রে বসে গল্প করতো আর চাকু দিয়ে কাঠ কেটে নানান রকমের কাঠের সুন্দর-সুন্দর খেলনার জিনিস তৈরি করতো। অন্য তেমন আর কিছু করার ছিলো না। ব্যস্ত থাকার একটা উপায় খুঁজে পেয়ে স্যামও খুশি হলো। বোস্টন ভাগের চার মাস পর কার্ভো জাহাজ কোলকাতা পৌঁছার সময়ে পুরোনো খালাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী যারা তাদের চাইতে সুন্দর, কখনো প্রায় সমপর্যায়ের কাঠ খোদাই-এর কাজে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলো স্যাম।
কোলকাতার বন্দরে জাহাজ এসে যখন নোঙর করলো সঙ্গে-সঙ্গে তাদের একঘেয়েমির অবসান হলো। নিউ ইংল্যান্ড থেকে প্রথম সফরে আসা এক সরল যুবকের জন্যে শহরটার চোখ-ধাঁধানো চটক আর অপরিচ্ছন্নতার মধ্যেকার পার্থক্য প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিলো। তবে কোলকাতার সব দর্শনীয় বস্তুর মধ্যে যেটা স্যামের মনকে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করেছিলো তা হলো তারই দেশী ভাই এক অ্যামেরিকানের হাতের তৈরি কিছু জিনিস। সেটা হলো কলকাতার বন্দুকের দোকানে জানালায় রক্ষিত পুনঃপুন ক্রিয়াশীল পিস্তল। সেটা এলিশা কোলিয়েরের আবিষ্কার এবং এমনভাবে তৈরী করা হয়েছিলো যে, একবারে ছটা গুলী ভরে পর-পর দুবার গুলী করা যেতো।
স্যামের বড়োভাইয়ের থেকে কেনা সেই পুরোনো ঘোড়া-পিস্তলের মতোই কোলিয়েরের বন্দুকটারও চকমকি পাথরের সাহায্যে আগুন জ্বলতো। কিন্তু মামুলি চকমকি অন্ত্রের মতো এটার নলের মধ্য দিয়ে বারুদ ভরা হতো না। পিস্তলটার নলের ঠিক পিছনেই বসানো ছিলো একটা দু’ছিদ্র বিশিষ্ট গোলাকার ঘূর্ণায়মান সিলিন্ডার। এই ঘূর্ণায়মান সিলিন্ডারে ছিলো ভিন্ন-ভিন্ন পর্যায়ক্রমিক ছয়টি বারুদ-কোঠা। ব্যবহারের পূর্বে প্রতিটি কোঠা ভিন্ন-ভিন্নভাবে বারুদ ভর্তি গুলী দিয়ে পূর্ণ করতে হতো। জীবন রক্ষার জন্য যাদের ঘন-ঘন গুলী ভরতে হয়, তাদের জন্যে এই অস্ত্রটা খুবই অসুবিধাজনক ছিলো।
তাছাড়া আরো বেশ কিছু ত্রুটি, ঝামেলা ও অসুবিধা ছিলো। ঘূর্ণায়মান সিলিন্ডারটি ছিলো বড়ো ও অসুবিধাজনক। প্রতিবার গুলী চুড়বার পর ওটাকে হাতে ঘুরিয়ে নিতে
হতো—তার অর্থ, প্রকৃতপক্ষে এই পিস্তলটিও স্বয়ংক্রিয় ছিলো না। এবং ওটায় এতো বেশি জটিল যন্ত্রাংশ ছিলো যে, সব সময়ই কোনোটা-না-কোনোটা বিকল হয়ে যেতো। কোনো-কোনো সময় সিলিন্ডারের অন্যান্য কোঠায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়তো। তার মানে, কখনো এ রকম ঘটলে সবগুলো কোঠা এক সঙ্গে ফেটে কেবল পিস্তলটি নষ্ট হতো না, তার চালক কিংবা মালিকের জীবন নিয়েও হয়তো টানাটানি শুরু হয়ে যেতো।
এসব নানান রকম অসুবিধা ছাড়াও, কোলিয়েরের পিস্তল এখন একেবারে অচল হয়ে পড়েছে। খোলা বারুদের প্রয়োজন হয় বলে চকমকি অস্ত্রগুলো খুব দ্রুত অচল এবং জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিলো। আর এই রকম পিস্তলের জায়গা দখল করছিলো এমন সব বন্দুক যেগুলোতে সদ্য আবিস্কৃত ‘পাকাশান ক্যাপ ব্যবহার করা হতো। বন্দুকের হ্যামারের (হাতুড়ির আঘাতের সঙ্গে-সঙ্গে এসৰ ক্যাপ বিদীর্ণ হতো লক্ষ্যবস্তুর প্রতি।
স্যাম, কোলিয়েরের বুদ্ধির প্রশংসা করলো সত্যি; তবে সে বুঝতে পারলো,-নতুন ‘পার্কাশন ক্যাপে’র উপযোগী করে একটা কার্যক্ষম সত্যিকারের পুনঃপুন ক্রিয়াশীর অস্ত্র তৈরি করতে হবে। তার বিশ্বাস ছিলো, একটা কার্যক্ষম পুনঃপুন ক্রিয়াশীল পিস্তল হাতে যে কোনো লোক প্রচলিত বন্দুকধারী অনেক লোককে একা হারিয়ে দিতে পারবে। স্যাম অবাক হয়ে আরো ভাবলো, আজ পর্যন্ত এমন কোনো বিজ্ঞানী তেমনি একটা পিস্তল আবিষ্কার করেননি?
কার্ভো জাহাজ কোলকাতা বন্দর ছেড়ে যাবার পথে স্যাম, কোলিয়েরের পিস্তলের নকশাটা আঁকলো নিজে। পার্কাশন কাপের উপযোগী করে কোলিয়েরের ঘোরাবার প্রণালীটাকে কাজে লাগাবার কোনো নতুন পন্থা বের করা যায় কিনা, সেজন্যে স্যাম ঐ নকশাটা অনেকদিন ধরে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করলো। এক সময় কার্ভো জাহাজ উষ্ণ ও আর্দ্র বঙ্গোপসাগর পার হলো। জাহাজের গতির সাথে তাল মিলিয়ে এবার স্যাম নিজের বুদ্ধি মতে নতুন-নতুন নকশা আঁকতে শুরু করলো। ভারত মহাসাগরে গিয়ে জাহাজ পড়ার আগে ও পরে যা কিছু সময় পাওয়া গেলে সেই সময়ের মধ্যেই সে সম্পূর্ণ নতুন একটা পুনঃপুন ঘূর্ণায়মান সিলিন্ডারের নকশা তৈরি করে ফেললো। তার বিশ্বাস, এতে পার্কাশন ক্যাপ ব্যবহার করা যাবে।
কিন্তু এতো কিছু করার পরেও তার সামনে একটা বিরাট সমস্যা রয়ে গেলো। একটা সত্যিকার স্বয়ংক্রিয় রিভলভার তৈরি করাই তার ইচ্ছে। সে এমন একটা উপায় উদ্ভাবন করতে চাইলো যাতে প্রতিবার গুলী করার সঙ্গে-সঙ্গে আপনা-আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিলিন্ডার ঘুরে যায় এবং পরবর্তী গুলী করার জন্যে সেটাকে জায়গা মতো ঠিকভাবে আটকে রাখতে সক্ষম হয়।
একদিন বিকেলবেলা অপ্রত্যাশিতভাবে স্যাম তার কাঙ্খিত সূত্রটা পেয়ে গেলো। স্যাম ডেকে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে খালাসীদের জাহাজের চাকা ঘোরানোর কাজ দেখছিলো। যেভাবেই চাকা ঘোরানো হলো না কোনো একটা স্পোক সব সময়েই স্থির ক্লাচের
লাইনে এসে স্থির হয়ে যেতো। এই ক্লাচটি স্পোককে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে চাকাটাকে নিজ জায়গায় আটকে দিতো। স্যাম জাহাজের চাকার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রইলো স্থির দৃষ্টিতে। সে বুঝতে পারলো, এটা তার পিস্তলের ঘূর্ণায়মান সিলিন্ডারেরই অনুরূপ। চাকার স্পোকগুলো সিলিন্ডারের মধ্যেকার গুলীর কোঠাগুলোর মতোই। পার্থক্য শুধু কাঠামোয়।
প্রতিবার জাহাজের চাকা ঘোরার সঙ্গে-সঙ্গে একটা স্পোক স্থির ক্লাচের একই লাইনে এসে পড়তে এবং সেই ক্লাচ চাকাটাকেও ঠিক-ঠিক মতো আটকে রাখতো। প্রতিবার পিস্তলের সিলিন্ডার ঘোরার সঙ্গে-সঙ্গে একটা গুলির কোঠা পিস্তলের স্থির নলের একই লাইনে এসে পড়বে এবং নলটা সিলিন্ডারকে ঠিক মতো আটকে রাখায় ব্যাপারে ক্লাচের মতো কাজ করবে। এই ধারণায় নিজের মনকেও স্যাম স্থির করলো। স্যাম এই ধরনের পিস্তলই আবিষ্কার করতে চাইছিলো।
এই সূত্র ধরে স্যাম সঙ্গে-সঙ্গে আবার নতুন নকশা আঁকতে শুরু করে দিলো। এবার সে বুঝতে পেরেছে, কিভাবে সিলিণ্ডারকে পুনরায় জায়গামতো ঠিক-ঠিক আটকে রাখা যায়। কিন্তু কিভাবে ওটাকে আপনা থেকেই ঘোরানো যাবে না সে তখন পর্যন্ত বুঝতে চেষ্টা করেও বুঝতে পারলো না। অবশেষে সে ভাবলো—পিস্তলের ঘোড়া টানার পূর্বে হ্যামারটাকে পিছনে টানার সহজ পন্থা দ্বারা একই সঙ্গে সিলিন্ডারকে ঘুরিয়ে জায়গা মতো আটকে রাখা যেতে পারে। গুলী করার পর পিস্তলের হ্যামার পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে সিলিন্ডারটা ঘোরানোর জন্যে খুলে যাবে। তারপর আবার হ্যামার টেনে সিলিন্ডার ঘুরিয়ে নলের সঙ্গে পরবর্তী কোঠাটা একই লাইনে এসে যাবে। বলা যায়, তার এই ধারণাটা যদি কার্যকরী করে প্রস্তুত করা যায়, তাহলে পিস্তলটাকে উপর্যুপরি কয়েকবার দ্রুত ব্যবহার করা যাবে।
কার্ভো জাহাজ উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আফ্রিকার মূল ঘেঁষে উত্তরমুখী হয়ে লন্ডনের পথে রওয়ানা হলো। স্যাম তার পকেট-ছুরিটা দিয়ে একখন্ড কাঠ নিয়ে তার রিভলবারের একটা মডেল তৈরির কাজ শুরু করে দিলো। তার আবিষ্কার যাতে জাহাজের কেউ দেখতে না পারে, সেজন্যে সে তার পকেটে কার্ভো জাহাজের একটা অর্ধ সমাপ্ত হাতে তৈরি কাঠের মডেল রেখে দিতো। কেউ কাছে গিয়ে আসছে দেখলেই সে ওটা পকেট থেকে বের করে নিতো। রাত্রে শোয়ার আগে স্যাম তার বন্দুকের মডেলটা তার বাক্সে কাপড়ে মুড়িয়ে লুকিয়ে রাখতো।
কার্ভো জাহাজ ইংলন্ডে বেশীদিন থাকেনি। আবার আটলান্টিক পার হয়ে এক বছর পর জাহাজটা বোস্টন বন্দরে নোঙর করলো। স্যামের পিতা তার অপেক্ষায় জাহাজের সিড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্যামকে তিনি প্রায় চিনতেই পারলেন না। সে আরো বড়ো, আরো রুক্ষ চেহারার হয়ে গেছে। রোদে পুড়ে তার চেহারা তামাটে হয়ে গেছে। হাল্কা বাদামী রঙের ঘন মোটা দাড়ি তার মুখে শোভা পাচ্ছিলো। সে ডেক থেকে তার বাবাকে চিৎকার করে ডেকে উঠলে তার কণ্ঠস্বরে কেমন যেনো একটা বন্যভাব ফুটে উঠলো। তার বাক্সে লুকানো ছিলো একটা রিভলবারের মডেল বার বার গুলী না ভরেই ওটা থেকে পর্যায়ক্রমে গুলী ছোড়া যায়। অন্ততঃ এ রকম হবে বলেই স্যামের ধারণা ছিলো।
বাড়ি ফেরার পর তার বাবা ক্রিস্টোফার অনেকক্ষণ ধরে মডেলটা পরীক্ষা করলেন। অবশেষে তিনি বললেন,-স্বীকার করছি, জিনিসটা বেশ কৌশলের এবং বুদ্ধি খাটিয়ে তৈরি। কিন্তু স্যাম, এটা এমনিতে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না যে, ওটা দিয়ে উন্নততর কিছু একটা কাজ হবে।
স্যাম বাবা’র সাথে তার কল্পিত এবং উদ্ভাবিত পিস্তলের বিষয়ে জোর তর্ক জুড়ে দিলো,—এটাই কার্যকরী হবে, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। ভালোভাবে চিন্তা ভাবনা করেই আমি এটা তৈরি করেছি বাবা। বাবা, আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন, এরকম একটা বন্দুকের কাছে অন্য সব আগ্নেয়াস্ত্র একেবারে খেলনা জিনিস হয়ে দাঁড়াবে। চাই কি, বিশ্ববাসীকে আমি অবাক করে দেবো।
স্যামুয়েল কোন্ট-এর হাতে চাকু দিয়ে তৈরী কাঠের মডেল
বন্দুকের আধুনিক রূপ এই রিভলবার সত্যি-সত্যি কাজ করবে কিনা, তা জানার একটা মাত্র পথ আছে। ইস্পাতের একটা মডেল তৈরির জন্যে একজন অভিজ্ঞ বন্দুক-মিস্ত্রী নিয়োগ করতে হবে। তা করা ব্যয়সাপেক্ষ। তবু অমায়িক এবং সন্তানের প্রতি যত্নবান বাবা ক্রিস্টোফার স্যামের আবিষ্কারের সম্ভাবনা উপলব্ধি করলেন। আবারো ক্রিস্টোফারের মন্তব্য,–এর মতো দ্বিতীয় আর একটাও নেই। তিনি দেখলেন, ছেলেটার কথার কোনো বিরাম নেই।
—“আমার বন্দুক আগ্নেয়াস্ত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেবে।'
—এ কথা শুনতে শুনতে তাঁর কান ঝালাপালা হয়ে গেলো। শেষে মিঃ ক্রিস্টোফার একটা পরীক্ষামূলক মডেল তৈরির জন্যে বেশ কিছু ডলার দেবেন বলে স্যামকে কথা দিলেন।
‘এনসন চেজ’ নামক হার্টফোর্ডের এক বন্দুক-মিস্ত্রীকে দিয়ে স্যাম ও তার বাবা স্যামের উদ্ভাবিত বন্দুকের মডেলটা তৈরি করালো। রিভলভারটা তৈরি হয়ে গেলে স্যাম আর তার বাবা ওটা পরীক্ষা করার জন্যে বাড়ি নিয়ে গেলেন। স্যাম রিভলভারটা শক্ত করে বেঁধে একটা গাছকে লক্ষ্য করে ওটার ট্রিগারের সঙ্গে একটা লম্বা তার লাগিয়ে নিলো। তারপর সেটার ঘোড়া টেনে সে পিছনে সরে এসে তারটি ধরে দিলো টান। সঙ্গে সঙ্গে একটা বিরাট বিস্ফোরণ। লোহার স্পিন্টারগুলো বা টুকরোগুলো চারদিকে ছুটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে স্যাম ও তার বাবা মাটিতে শুয়ে পড়লেন। স্থানটি বেশ ধূমায়িত হয়ে গেলো। ধোঁয়া সরে যাবার পর স্যাম গম্ভীরভাবে তার বন্দুকের ভাঙা টুকরোগুলো পরীক্ষা করতে এগিয়ে গেলো। সে যা ভয় করেছিলো তাই হয়েছে। অন্যান্য চেম্বারে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ার ফলে সবগুলো গুলী একত্রে ফেটে পড়েছে এবং বন্দুক ভেঙে পড়ায় সে তা বুঝতে পারলো-- এটাই প্রধান কারণ। স্যামুয়েলের বাবা এগিয়ে গিয়ে স্যামের কাঁধের উপর হাত রেখে বললেন, ‘লক্ষ্মী সোনা বাবা আমার, দুঃখ করে কোনো লাভ নেই। ওটা দিয়ে কাজ না হলেও তোমার পিস্তলটা সত্যি একটা নতুন ও চমৎকার আবিষ্কার এবং কার্যক্ষম অস্ত্র। দেখো, কখন যে তুমি এক নতুন আবিষ্কারে হাত দিয়ে ফেলবে, তা তুমি হয়তো নিজেই বুঝতে পারবে না।’
স্যাম গম্ভীর ও বিষণ্ণ মুখে ভাঙ্গা টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে বললো, যতো সতর্ক ভাবে করেছি বলে আমার ধারণা ছিলো, আমি জিনিসটা ততো সতর্কতার সঙ্গে করতে পারিনি বাবা। তবুও আমার বিশ্বাস, আমি ওটাকে সত্যিকার কাজের উপযোগী করে তৈরি করতে পারবো একদিন না একদিন। আর তাছাড়া, অন্য কিছু আবিষ্কারের প্রতি আমার আগ্রহ নেই।
স্যাম ড্রইং বোর্ডে ফিরে গিয়ে নতুনভাবে ঘূর্ণায়মান সিলিন্ডারের নকশা তৈরি করলো। এবার সে গুলীর চেম্বারগুলোকে ইস্পাতের পর্দা দিয়ে আলাদা-আলাদা খাঁজ তৈরি করে মজবুতভাবে পৃথক-পৃথক কামরা তৈরি করে দিলো। এবার স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে না বলেই তার বিশ্বাস। নকশাটা দেখার পর তার বাবা আরেকটা মডেলের খরচ ‘দিতে রাজী হলেন।' এনসনচেজ সেই পুরনো বন্দুকের মিস্ত্রী কাজে লেগে গেলো। কিন্তু তারা আবারো হতাশ হলো। এবারের কারণটা অবশ্য ভিন্ন। একত্রে সব চেম্বারে বিস্ফোরণ বন্ধের জন্যে স্যামের প্রক্রিয়াটা খুবই ফলপ্রসু হলো। কিন্তু মডেলের সিলিন্ডারটা জায়গা মতো আটকে থাকলো না। স্যামুয়েল তাই আবারো একটা নকশা তৈরি করলো। বন্দুক মিস্ত্রী চেজ-ই তৃতীয় মডেলটি তৈরি করলো। এবার কিন্তু ওটা থেকে কিছুতেই গুলী ছোঁড়া সম্ভবপর হলো না। এবার ভেঙে পড়লেন বাবা ক্রিস্টোফার।
স্যামের বাবা ক্রিস্টোফার কিছুটা মনোক্ষুন্ন হয়েই হাত গোটালেন। রেশম-মিলের ব্যবসাও খুব ভালো যাচ্ছিলো না। নগদ ডলার আতশবাজীর ধোঁয়ায় উড়িয়ে দেবার মতো প্রচুর সঙ্গতি তাঁর ছিলো না। হতে পারে, রিভলভারের ব্যাপারটা অভিনব; কিন্তু ওটাকে নিখুঁতভাবে তৈরি করতে শত শত, এমন কি হাজার-হাজার ডলারের প্রয়োজন হতে পারে। হয়তো এটা কোনোদিনই স্যামের কাঙিখত রূপে কার্যকরী হবে না। কার্যকরী হলেও এটা এমন বৈপ্লবিক যে, এটা কোনোদিনই হয়তো জনসাধারণের স্বীকৃতি পাবে না। এটা সহজ লভ্য নয় তাই।
সরলমনা সন্তানের প্রতি যত্নবান বাবা ক্রিস্টোফার তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিলেন,-‘তোমার আবিষ্কারের কথা ভুলে গিয়ে আবার সমুদ্রে নাবিকের কাজেই ফিরে যাও বাবা। কার্ভো জাহাজ ছেড়ে আসার সময় ক্যাপ্টেন মিঃ স্প্যাল্ডিং তোমার খুব প্রশংসা করেছিলেন। তোমাকে আবার নাবিকরূপে ফিরে পেলে তিনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন। পরবর্তী যাত্রায় হয়তো তুমি অফিসারের পদমর্যাদা পেয়ে যেতে পারো। দেখো স্যাম, দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের খুব দ্রুত উন্নতি হচ্ছে আর আজকাল অ্যামেরিকার জাহাজ গুলো সমস্ত বিশ্ব জুড়ে বাণিজ্যের জন্যে বন্দর থেকে বন্দরের লক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। তোমার মতো বুদ্ধিমান, সৎ চরিত্র ও চালাক ছেলের জন্যে জাহাজের চাকুরি একটা চমৎকার এ্যাডভেঞ্চারাস পেশা।'
এ কথা শুনে স্যাম আঁতকে উঠলো! প্রথম সমুদ্র যাত্রাতেই স্যাম তার জীবনকে খাঁপ খাওয়াতে পারেনি—তার পছন্দও হয়নি অথই সমুদ্রের নোনা পানি ও নিঃসঙ্গতা। তাছাড়া তার আবিষ্কারকে ত্যাগ করার কোনো ইচ্ছেও তার নেই।—এই পিস্তলের পিছনে এতো খেটেছি যে, এখন আর সেটাকে ফেলে রাখতে পারি না। আমার স্থির বিশ্বাস, এটাকে আরো নিখুঁত করতে পারবো। এটার পিছনে আরো কটা দিন আমাকে নষ্ট করতে দাও বাবা। আমি তোমাকে ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে অনুরোধ করছি, বাবা।
ছেলের এই রকম স্থির সিদ্ধান্তের কথা শুনে উত্তরে তার বাবা বললেন, তুমি এই পিস্তলের পিছনে কাজ করে তোমার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে বলে এমন তরো আশা তুমি করতে পারো না। বাজে কাজের পেছনে আমার ঘাম ঝড়ানো কষ্টে রোজগারের ডলার কেবল ঢেলে যাবো, তা তুমি কেমন করে ভাবতে পারো? এমনিতেই তোমার আবিষ্কারের পিছনে অনেক অর্থ-কড়ি খরচ এবং চেষ্টা করে দেখেছি। কথাটা একটু মন দিয়ে ভেবে দেখো। সমুদ্রে ফিরে যেতে না চাইলে তোমার জন্যে নিজস্ব কল-কারখানায় সব সময়ই জায়গা রয়েছে।
তখনকার মতো রেশম কারখানার কাজে ফিরে যেতে স্যাম রাজী হলো। কারখানায় কাজে ফিরে যাবার আগে সে তার রিভলবারের নকশায় আরো নতুন কিছু পরিবর্তন সাধন করলো। তারপর আরো বেশী করে কটা পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করার জন্যে সে তার সাগরে নাবিক থাকা কালীন জমানো এক বছরের সব ডলার এনসন চেজকে দিয়ে দিলো। পরবর্তী কয়েক মাসে, যখন স্যাম কারখানায় কাজ করছিলো, তখন বন্দুক মিস্ত্রী চেজ কাজের উপযোগী এক জোড়া রিভলবার তৈরি করতে সমর্থ হলো। কিন্তু সেগুলোও তেমন কিছু আহামরী ভালো কাজ দিচ্ছিলো না। সেগুলো স্যামের কাঙ্খিত সহজে কার্যক্ষম নিখুঁতভাবে তৈরি রিভলবার হয়নি। স্যাম গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখলো, তার বাবার কথাটাই ঠিক। তার আসল কাঠের মডেলটা সবার পছন্দসই আগ্নেয়াস্ত্রে পরিপূর্ণ রূপ নিতে অনেকদিন, অনেক সময় ব্যয় করতে হবে। শুধু বহু সময়ই লাগবে এটাই শেষ কথা নয়, ডলারও লাগবে বিরাট অঙ্কের। অনেক আকাশ-পাতাল ভালো স্যাম। কিন্তু উপযুক্ত পন্থা স্যাম ভেবে পেলো না, সে ডলার পাবে কোথা থেকে? তার বাবা যখন তার এই কাজে আর ডলার দেবেন না বলে সরাসরি তাকে জানিয়ে দিয়েছেন সেখানে অন্যকে কিসের ভরসা? কোনো ভরসা নেই,তখন স্যাম নিজেই সিদ্ধান্ত নিলো, তাকেই নিজের থেকে এই খরচের ডলার জোগাড়ের উপায় বের করতে হবে।
রেশম কারখানার রাসায়নিক ল্যাবরেটরিতে সে আশ্চর্যজনকভাবে এর একটা সুন্দর উত্তর পেয়ে গেলো। স্যাম যখন সমুদ্রে তখন মিলের কেমিস্ট স্মিথ কাগজে স্যার হামফ্রি ডেভীর নাইট্রাস অক্সাইড নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা পড়েছিলো। হাসির গ্যাস নামেই এটা বেশি পরিচিত। বিখ্যাত ইংরেজ রসায়নবিদ ডেভী আবিষ্কার করলেন যে নাইট্রাস অক্সাইড যা প্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে দেহে একপ্রকার ক্ষণস্থায়ী নির্দোষ মাতলামির সৃষ্টি হয়। কেউ-কেউ উদ্দাম হাসিতে ফেটে পড়েন আর কল্পনার পাখা মেলে দেন। অনেকে অবিশ্বাস্য শারীরিক কসরত যা সত্যিকার অ্যাক্রোবেটিং-এর মতো দেখাতে শুরু করেন। কিছু লোক গভীর ও মুগ্ধ দিবাস্বপ্নে গা এলিয়ে দেন। এই হাসির গ্যাস বা ‘ল্যফিং গ্যাস’ এর ক্রিয়া মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। একবার যে এই গ্যাস গ্রহণ করেছে সে আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
স্মিথ নাইট্রাস অক্সাইড তৈরি করা শিখে ফেলেছে। প্রক্রিয়াটা তার কাছে খুবই সহজ। গ্যাসের সম্বন্ধে তার যা কিছু জানা ছিলো তা সে স্যামকে স্বেচ্ছায় শিখিয়ে দিলো। দুই বন্ধুতে মিলে কোনো-কোনো বিকেলে একে অন্যের উপর নাইট্রাস অক্সাইড প্রয়োগ করে বেদম হাসির ফোয়ারা সৃষ্টি করতো। কিন্তু ওখানে কী সব যে হচ্ছিলো সে বিষয়ে মিলের শ্রমিকদের কোনো ধারণাই ছিলো না--তবে তাদের স্থির বিশ্বাস, রাসায়নিক ল্যাবরেটরিতে দুটো আস্ত গারদে পুরে রাখার মতো পাগল বাস করে।
স্যামের পাগলামির মধ্যেও ঠিকই তার একমাত্র কাঙ্খিত অর্থ রোজগারের পথ খুঁজে বের করে নিলো। তার খেয়াল হলো যে, সাগরে এক বছরে সে যতো ডলার আয় করেছে তার চেয়ে অনেক বেশি ডলার হাসির গ্যাস দিয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আয় করার সুযোগ রয়েছে। এবং এই কাজের জন্যে তাকে শুধু একটা সহজে বহনোপযোগী ল্যাবরেটরি বা গ্যাস তৈরির হাঙ্কা চেম্বার তৈরি করতে হবে। তারপর নিউ ইংল্যাণ্ডের গ্রামাঞ্চলের পল্লীতে-পল্লীতে নাইট্রাস অক্সাইডের খবর একবার চোঙ্গা ফুকে পৌছে দিলেই চলবে। এভাবে সে নিশ্চয়ই একদিন দেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রদর্শনীর সঙ্গে সকলের গ্রহণযোগ্য তার বন্ধুর আবিষ্কার হাসির গ্যাস বিরাট আলোড়ন ও সুনাম অর্জনে সমর্থ হবে। নিউ ইংল্যাণ্ডের অনেক অঞ্চলেই হাল্কা আমোদ-প্রমোদকে নীতিহীন মনে করে খারাপ নজরে দেখা হতো। উদাহরণস্বরূপ যা বলবো তা শুনে এই আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশের প্রথম শিক্ষিত লোকজনও আশ্চর্য হবেন। তা হলো, সমস্ত কানেক্টিকাট অঙ্গরাজ্যে একটিও থিয়েটার মঞ্চ ছিলো না। তবে হাসির গ্যাসের প্রদর্শনী একাধারে বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক হবে এটা একটা প্রধান অসী। ওটা যদি আবার আমোদের ব্যাপার হয় তাহলে তো আরো ভালো। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে সেই আমোদ-প্রমোণ থাকবে, তার ব্যাপারে ভীষণ গোঁড়া কোনো পিউরিটানও আপত্তি তুলতে পারবে না। বরঞ্চ তাকে অঙ্গরাজ্যের লোকেরা অভিনন্দিত করবে।
স্যাম একটুও দেরি করলো না। সে কতোগুলো বোতল, টিউব, রিটোর্ট (কাঁচের বক্র নল) এবং প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য ও রবারের পাইপ লাগানো একটা চেপ্টা মতো জিনিস জোগাড় করলো। তারপর একটা কাঠের প্যাকিং বাক্সে সবগুলো ভর্তি করলো
সে। এবার তার যাত্রা শুরু। ওয়ে আর ও হার্টফোর্ডের মধ্যবর্তী ছোটো-ছোটো শহরের চারপাশের গ্রাম্য রাস্তা ধরে ঘুরতে লাগলো সে। কোনো জনপদে আসার পর সেই জনপদের রাস্তার চৌমাথায় বা গ্রামের মধ্যবর্তী মাঠে তার সরঞ্জামাদি সাজিয়ে রেখে কৌতুহলী, দর্শক জমা হবার অপেক্ষায় বসে থাকতো। তারপর আস্তে-ধীরে তাঁর চারপাশের লোকজনকে মানে নিজেকে, হাতে-কলমে বিজ্ঞানী বলে দর্শকদের কাছে তার পরিচয় দিতো। তখনো স্যাম মাত্র সতেরো বছরের তরুণ। তবে সাগরে নাবিক থাকাকালীন গজানো তার দাড়ি আরও কিছুটা বড়ো হওয়ায় অবশ্য বয়সের চাইতে তাকে একটু বেশী বয়স্ক মনে হতো। তার বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের প্রদর্শনী শহুরে লোকদের মধ্যে খুব আনন্দময় বিস্ময়কর ধারণার সৃষ্টি করেছিলো।
একবার কিছু লোক জড়ো হলে স্যাম নাইট্রাস অক্সাইড' সম্বন্ধে একটা ক্ষুদ্র বক্তৃতায় এই গ্যাস-“আমাদের যুগের শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর অন্যতম” বলে উল্লেখ করলো। তারপর কিছুটা গ্যাস তৈরি করে নলের মুখের চোঙ্গাটা তার নাকে মুখে ধরে সে নিজের উপর এই গ্যাসের প্রভাব প্রদর্শন করলো। এ গ্যাসের কোনো খারাপ প্রভাব নেই, সে বিষয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করে এবার যারা এ গ্যাস নিজেরাই গ্রহণ করতে চায় তাদের স্যাম ডাক দিতো। কিছু কিছু সাহসী দর্শক স্যামের প্যাকিং বাক্সের ল্যাবরেটরীর কাছে এসে উৎসাহ নিয়ে দাঁড়াতো। তারা সবাই তার বিরাট বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার পরীক্ষা করতে ভীষণ রকম উদগ্রীব হয়ে উঠতো। স্যামের অকল্পনীয় অঙ্গভঙ্গি জনতার আমোদের সামগ্রী হলো। ইতিপূর্বে এরকম আমুদে আর কিছু তারা এ শহরে কখনো দেখেনি।
কিছুদিনের মধ্যেই স্যামের বিজ্ঞান আর গ্যাস হাসির তামাশায় সংমিশ্রণ ভীষণ আলোচিত হলো। একদিনেই স্যাম তার তামাশার সরঞ্জামাদি নিয়ে নানান শহরে ঘুরে বেড়াতো। যখনই সম্ভব হতো তখনই সে বিনা পয়সায় ঘোড়ার গাড়ি ও মালগাড়িতে চড়ে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতো। প্রতিবার তামাশা দেখানোর পর সে হ্যাটটা উল্টো করে ধরে বাড়িয়ে দিয়ে দর্শকদের ধারে কাছে এগিয়ে ধরতে। তাতে যে ডলার আসতো তা ছিলো স্যামের কাছে আশাতীত, অকল্পনীয়!
তামাশার কথা প্রচারে সত্যিকারের একজন ভদ্র জোকারের লক্ষণ অতি দ্রুত তার মধ্যে প্রকাশ পেলো। নতুনত্বের প্রথম পর্যায়ে সবচেয়ে বড় অক্ষরে সে বেশ কিছু হ্যাণ্ডবিল ছাপালো। তবে কোনো স্থানে গ্রামে বা শহরে খেলা দেখতে যাওয়ার পূর্বেই
সে এগুলো, গ্রামে-নগরে-বন্দরে পাঠিয়ে দিতো। ফলে সব সময়ই দর্শকগণ তার অপেক্ষায় অধীর হয়ে বসে থাকতো। পরে মুগ্ধ দর্শকদের কেউ-কেউ তাকে ‘ডাক্তার' বলে সম্বোধন করায় এই মোক্ষম সুযোগ গ্রহণ করে সে নিজেকে ডাঃ কোল্ট বলে পরিচয় দিতে শুরু করে দিল। কিছুদিন পর সে তার পারিবারিক নামের একটা পুরোনা বানান গ্রহণ করে নিজের নাম ‘ডাঃ কোল্ট' ছাপালো। এটা আরো বেশি জমকালো মনে হলো তার কাছে। সর্বশেষে সে নিউইয়র্ক, লন্ডন ও কোলকাতায় নিজেকে ‘ডাঃ কোল্ট' রূপে নিজেই প্রচার করলো। সমুদ্র যাত্রায় সে লন্ডন ও কোলকাতায় আর ছোটোবেলায় একবার তার বাবার সঙ্গে নিউইয়র্কে গিয়েছিলো। তাই কথাটা কেউ আর তাকে মিথ্যে প্রচার করছে—একথাও বলতে পারবে না।
এসব খেলা দেখিয়ে-দেখিয়ে দু’মাসের মধ্যে স্যাম অনেক অর্থ-কড়ি জমিয়ে ফেললো। এনসন চেজ’কে তার বন্দুকের সর্বশেষ পরীক্ষামূলক মডেলগুলো তৈরির খরচ এবং ওয়াশিংটনে গিয়ে পেটেন্ট-এর রেজিস্ট্রেশনের জন্যে দরখাস্ত করার ব্যাপারে যাতায়াতের খরচ বাবদ যা ছিলো সেটাই যথেষ্ট। বাড়ি গিয়ে পরিবারের সকলের সঙ্গে দেখা করে আসা এবং বাড়িতে পূর্বের রক্ষিত তার মডেলগুলো নিয়ে আসার জন্যে সে বাড়ির পথে রওয়ানা হয়ে গেলো।
৩ টি পর্বের ২য় পর্ব শেষ হল।
৩য় পর্ব পড়তে ক্লিক করুনঃ বিজ্ঞানী স্যামুয়েল কোল্ট এর রিভলভার উদ্ভাবনের দু:সাহসিক কাহিনী - story of the invention of revolver by Samuel Colt - part 3 of 3
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন