![]() |
স্যামুয়েল কোল্ট,invention of pistol, invention of revolver,পিস্তল আবিষ্কার, রিভলভার আবিষ্কার,বন্দুক আবিষ্কারের কাহিনী,রিভলভার উদ্ভাবন |
বিজ্ঞানী স্যামুয়েল কোল্ট এর রিভলভার উদ্ভাবনের দু:সাহসিক কাহিনী - story of the invention of revolver by Samuel Colt - part 1 of 3
জন্মঃ ১৯ই জুলাই ১৮১৪ মৃত্যুঃ ১০ই জানুয়ারী ১৮৬২
১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দের সোনাঝরা এক শীতের বিকেল। কোলকাতা শহরের এক বন্দুকের দোকান। সাপ্তাহিক নিয়মে দোকানটি যথারীতি খোলা বিক্রির জন্যে। সেই দোকানের কাঁচের আলমারীর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে মাত্র ১৬ বছরের এক যুবক নাবিক। খিদিরপুর ডক-এ নোঙর করা বিশাল সামুদ্রিক জাহাজ তখন তার মনের অনেক দূরে। এই যুবকেরই নাম স্যামুয়েল কোল্ট। নাবিক পা দুটি সৈনিকের ভঙ্গিতে একটু ফাক করে শক্তভাবে একঠায় দাঁড়িয়ে। লোভ সামলাতে না পেরে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে সে দোকানের ভেতর তাকালো--যদিও দেখলে মনে হবে সে বুঝি জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে আছে। কাচের আলমারীতে বিক্রয়ের জন্য সাজানো একটা চকমকি-ঘোড়া অঙ্কিত পিস্তলের প্রতি তার দৃষ্টি আটকে আছে। নাবিক হয়ে বহু দেশ ভ্রমণ করলেও এমন অদ্ভুত, আশ্চর্য বন্দুক সে আগে দেখেনি।
বোস্টন থেকে আগত দুই মাস্তুলবিশিষ্ট এই বাণিজ্যিক-জাহাজের নাম কার্ভো। স্যাম তখনো একজন আনাড়ী ডেক সহকারী। এটাই তার প্রথম দূরদেশ—মানে, ভিন্ন এক মহাদেশে সমুদ্র যাত্রা এর আগে আভ্যন্তরীণ সমুদ্রযাত্রা আর জন্মভূমি নিউ ইংলন্ডের (ইউএসএ) গ্রাম ও পাহাড়-পর্বত থেকে দূরে কোথাও যাওয়া হয়নি। কিন্তু আজ সেই যুবক পৃথিবীর প্রায় অর্ধেকটা ঘুরে ঘুরে তার দাদীমার কাছে শোনা—যাদুর দেশে এসে হাজির। সমস্তদিন সে কলকাতার জনবহুল রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে কাটিয়েছে। তার কাছে কলকাতা এক রূপকথার শহর। এখানে এমন অনেক অপরিচিত দৃশ্য সে দেখতে পেলো, যা দেশে ফেরার পর বছরের পর বছর ধরে তার বন্ধু-বান্ধবীদের জন্যে গল্পের খোরাক হবে। তবু সমস্ত কলকাতার মধ্যে বন্দুকের দোকানের আলমারীতে রক্ষিত সেই চকমকি পিস্তলের মতো আর কিছুই তাকে তেমন মুগ্ধ করতে পারেনি। বন্দুকটি সম্বন্ধে খোঁজ নিতে দোকানে ঢুকে সে দেখতে পেলো,-এটা যতোটুকু অসাধারণ মনে হয়েছিলো আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি অদ্ভুত!
দোকানদার জিজ্ঞেস করলেন,-“আগ্নেয়াস্ত্র সম্বন্ধে কিছু জানো?”
স্যাম মাথা নেড়ে উত্তর দিলো,-না।
দোকানদার বলল, এতো ভালো কথা। তবে আমি বাজি রেখে বলতে পারি, ঠিক এটার মতো আরেকটা পিস্তল তুমি এর আগে দেখোনি। দেখো বাছা, এ অস্ত্রটায় কৌশলের বাহার আছে ঠিকই, তবে এটা তেমন খুব একটা কাজের নয়। এই দেখো,—তোমাকে দেখিয়ে দিচ্ছি।
—এ পিস্তলটা এলিজা কোলিয়ের নামক এক মার্কিন বন্দুক-মিস্ত্রীর আবিষ্কার, স্যাম একথা দোকানদারের কাছে শুনলো। দোকানী আরো বললো---পুনরায় গুলী ভরে পর-পর ছয়বার গুলী করার ব্যবস্থা করেই এটা তৈরি করা হয়েছে। আর সেজন্যেই এটা অদ্ভুত। দেখা দূরে থাকুক, স্যাম কোনোদিন এ রকম বন্দুকের নামও শোনেনি।
কেননা এটা খুব কাজের নয় তা ব্যাখ্যা করার জন্যে যখন দোকানদার পিস্তলটার নানা অংশের বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন সে ভালো করে তা লক্ষ্য করলো।-এটা জটিল, ব্যবহার করতে কষ্টকর এবং নির্ভরশীল নয়। একথা সত্যি, এতে ছয়টা গুলী ভরা যায়; কিন্তু গুলী ভরতে এতো সময় লাগে যে, এটা কখনোই একটা সাধারণ বন্দুককেও হার মানাতে পারবে না। মাঝে-মাঝে দুর্ঘটনাক্রমে ছয়টা গুলীই এক সঙ্গে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে বেরিয়ে পড়ে। তাতে লক্ষ্যবস্তর চেয়ে এটা তার মালিকের জন্যেই বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া কোলিয়েরের চকমকি-বন্দুকের মতো বন্দুক এখন অচল হৃয়ে পড়েছে। তেমন কোনো চাহিদা নেই।
বন্দুকের ব্যবসায়ী আরো বললেন,—মি কোলিয়েরের এতো পরিশ্রম সত্ত্বেও তার পিস্তল যতো না মূল্যবান তার চেয়ে বেশি বিরক্তিকর। যখন একজন লোক একটা বন্দুকের উপর তার জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে নির্ভর করেন, তখন তিনি নিশ্চিত হতে চান যে, সেটা নির্ভরশীল কি না। এক সময়ের এই ভারতবর্ষেই বৃটিশ অফিসারগণ এসব পিস্তল ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন আর এটা তারা ব্যবহার করেন না। এখন এগুলো সখের বিলাস সামগ্রী সংগ্রহকারীদের ‘এন্টিকস্’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দোকানদার পিস্তলটা একটু পালিশ করে আবার রেখে দিলেন এবং বললেন,-‘তবুও বলতে হবে, কোলিয়ের একজন চতুর বন্দুক-মিস্ত্রী ছিলেন; কারণ, প্রতিবার না ভরে বারকয়েক গুলী করার চিন্তাধারাটা তাঁর খুবই ভালো। তার ভাগ্য যদি আরো একটু সহায় হতো, তাহলে তার বড়োলোক হতে বিন্দুমাত্র দেরি হতো না—কেমন ঠিক বলেছি না? কি বলো খোকা?
স্যামও কথাটা স্বীকার করলো। সে দোকান থেকে বের হয়ে ধীর পায়ে তার জাহাজে ফিরে গেলো। সমস্ত পথে সে কেবল সেই পিস্তলটার কথাই ভাবছিলো। বিছানায় শুয়ে গভীর রাত পর্যন্ত সে কোলিয়েরের এই আবিষ্কারের ত্রুটির ব্যাপারটি নিয়ে অনেক কিছু চিন্তা করলো। যদি কেউ নিখুঁত ও কাজের উপযোগী একটা বন্দুক আবিষ্কার করতে পারে, যা থেকে একবার ছয়টা গুলী ভরে পরপর ট্রিগার টিপে ছোড়া যায়, তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে, সে ভেবে পেলো না। দোকানদার যেমন বলেছেন, হয়তো তার কথাই ঠিক হবে। ঐ বন্দুকের আবিষ্কারক রাতারাতি বড়লোক হয় যাবে।
পরদিন ভোরে কার্ভো জাহাজ নোঙর তুলে পুরো পাল খাঁটিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়লো। স্যাম তখনো কোলিয়েরের পিস্তলের কথাই ভাবছিলো। জাহাজ অবিরাম গতিতে ভারত মহাসাগর পার হয়ে, উত্তম আশা অন্তরীপ ঘুরে, উত্তরদিকে মোড় নিয়ে আফ্রিকার তীর ধরে ইংল্যান্ডের দিক পাড়ি জমালো। তখনো সেই অদ্ভুত পিস্তলের কথা স্যামের মাথায় কিলবিল করছিলো। সে বুঝতে পারলো, অনেক লোকের চেয়ে সে আগ্নেয়াস্ত্র সম্বন্ধে অনেক বেশি জানে। তাই সে অবাক হয়ে ভাবতে শুরু করলো, এলিজাশা কোলিয়েরের চেয়ে সে আরো ভালো কিছু তৈরি করতে পারবে কিনা। এবং সে সেই চেষ্টাই করবে বলে মনস্থির করলো।
প্রায় সব নাবিকের মতো স্যামও ডেকের উপর বসে কাঠ দিয়ে অদ্ভুত সব জিনিস পত্তর তৈরি করে তার অবসর সময়ের বেশির ভাগ কাটিয়ে দিতো। একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেললো নতুন এক খণ্ড কাঠ পেয়ে সে তার পকেটের চাকুটা ভালো করে একটু শান দিয়ে সেই কাঠ দিয়ে একটা বন্দুকের মডেল তৈরি
করতে লেগে গেলো একাগ্র চিত্তে। সেই মডেলটাই ‘পশ্চিম-জয়ী বন্দুক’ বা ‘কোল্ট রিভলভারের আদি নমুনা বলে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে আছে।
আজকের যুবক-নাবিক স্যামুয়েল কোল্ট আট বছর বয়স থেকেই বন্দুক নাড়াচাড়া করতে শুরু করেছিলো। তার জীবনে প্রথম পিস্তল: সে পেয়েছিলো সেই বয়সেই। এটাও একটা চকমকি ঘোড়াযুক্ত পিস্তল। ভারতের বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধে তার পিতামহ এটাই ব্যবহার করেছিলেন। এটা এতো বড়ো আর ভারি ছিলো যে, কিশোর স্যাম ওটা এক হাতে ঠিক মতো ধরে তুলতে পরতো না পর্যন্ত।
অবশ্য পিস্তলটা তার বড়ভাই জনকে উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু অনেকদিন থেকেই স্যামের নজর ওটার উপর। তবে পিস্তলটা ছিলো ভাঙা আর মরচে ধরা। বিপ্লবের পরে এটা বোধহয় কোনোদিনই আর কাজে লাগানো হয়নি। তা সত্ত্বেও, সহজে জন্ এটা হাতছাড়া করতে রাজী নয়। তাই সাম সেটা ক্রয়ের জন্যে তার বড়োভাইয়ের সঙ্গে ক্রেতা হয়ে দর-কষাকষি শুরু করে দিলো।
স্যাম বললো, ওটার বদলে আমি তোমাকে আমার মূল্যবান শিকারের ছুরিটা দেবো।
-শিকারের ছুরি! ওটা আবার শিকারের ছুরি হলো কবে থেকে? ও দিয়ে একটা পাউরুটি পর্যন্ত কাটা যাবে না। আর সেটাকেই বলছে, মূল্যবান শিকারের ছুরি?
-আচ্ছা, তবে আমার বরফে-চলার স্কেট গুলোও দেবো ছুরিটার সাথে। বড়োভাই জনের উত্তর, ভাগো এখান থেকে। দাদু আমাকে পিস্তলটা দিয়েছেন। ওটা দাদুর প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমি নিজের কাছেই রাখতে চাই।
স্যাম কিন্তু তাতেও হতাশ হলো না। স্যাম আবার বললো,--আমার শিকারের ছুরি, বরফে-চলার স্কেট ছুরি, আর আমার স্লেজ গাড়ি এগুলো সব আমি তোমাকে দিয়ে দেবো। কি বলো, এবার দেবে?
জন এবারও মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানালো। স্যামের বড়োভাই তার থেকে আরো সুবিধা আদায়ের ফন্দিতে গ্যাট ধরে রইলো।
শেষ চেষ্টা হিসেবে স্যাম-পুরো এক মাস কুয়ো থেকে পানি তুলে দেবে বলে অঙ্গীকার করলো। কারণ, স্যাম জানে তার ভাই এ কাজটাকে ঘৃণা করে। এবার ঔষধে ধরলো, স্যাম পিস্তলটা পেয়ে গেলো এবার। জন্ মনে করলো, খুব ঠকিয়ে দিয়েছে স্যামকে। কিন্তু স্যাম ঠিক তার উল্টোটা প্রমাণ করে ছাড়লো। স্থানীয় এক বন্দুক-মিস্ত্রীর কাছে পিস্তলটা নিয়ে গিয়ে স্যাম পিস্তলটার বিভিন্ন অংশ খোলার কৌশল শিখে নিলো। তারপর কিছু খুচরা যন্ত্রাংশ জুড়ে শেষে সেই মিস্ত্রীর সাহায্যেই সে ওটাকে আবার কাজের উপযোগী করে তুললো।
তখনকার দিকে অ্যামেরিকায় খুব ছোটো বয়সেই ছেলেরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে শিখতো। কিন্তু তাই বলে স্যামের মতো এতো ছোটো হবে, এটা কেউ মনে করতো না কখনোই। মেরামত-করা পিস্তলটা স্যামের হাতে দেখে তার মা ওটা তার কাছ থেকে নিজের হেফাজতে নিয়ে যেতে চাইলেন। স্যাম এমন হৈ-চৈ শুরু করে দিলো যে, তার মা ওটা আর তার কাছ থেকে নিতে পারলেন না; তবে তার মা একটা শর্ত দিয়ে স্যামকে বললেন,—উপযুক্ত বড়ো না হওয়া পর্যন্ত ওটা থেকে গুলী ছুঁড়বে না। মানে, বড়ো ভয়ের মতো বয়স হলেই ব্যবহার করতে পারবে, কী রাজী?
স্যাম মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করলো। মায়ের দেয়া কথা মতো যথেষ্ট বড়ো না হওয়া পর্যন্ত স্যাম ওটা দিয়ে গুলী ছুঁড়বে না।
স্যাম হার্টফোর্ডে বড়ো হতে লাগলো। ওখানে তার বাবা ক্রিস্টোফার জাহাজের ব্যবসায়ে কিছুটা ধনী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু স্যাম ছোটো থাকতেই ১৮১২ সালের যুদ্ধের পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটে তার বাবা সব কিছু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেলেন। তার কিছুদিন পরেই মানসিক কষ্ট ও অর্থাভাবে তার মা মারা গেলেন। পাঁচটি ছোটো বাচ্চার রক্ষণাবেক্ষণের ভার একা বাবা মিঃ ক্রিস্টোফার কোল্টের উপর বর্তালো। ওদিকে আবার অভাবের সময় নেয়া বন্ধু-বান্ধবদের টাকার দেনা তাকে পরিশোধ করার ব্যাপারেও সর্বক্ষণ প্রাণান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছিলো।
স্যামের মায়ের মৃত্যুর বছর দুই পরে মিঃ ক্রিস্টোফার বিয়ে করে আবার একটা নতুন ব্যবসায়ে হাত দিলেন। ম্যাসাচুসেটস্-এর ওয়েআর নামক স্থানে তিনি অ্যামেরিকার প্রথম রেশম কারখানাগুলোর একটি স্থাপন করলেন। মিলের জন্যে তাকে অনেক বেশি পরিমাণে ঋণ করতে হয়েছিলো। তাই তিনি স্থির করলেন, তার নতুন ব্যবসা রীতিমতো চালু না হওয়া পর্যন্ত কয়েকটি সন্তানকে দুরে পাঠিয়ে দেবেন।
তখন স্যামের বয়স মাত্র এগারো। কানেকটিকাটে’র ‘গ্ন্যাস্টনব্যারী’র নিকটবর্তী এক নিঃসন্তান চাষী দম্পতির কাছে স্যামকে পাঠিয়ে দেয়া হলো। ওখানে সে স্থানীয় ইস্কুলে পড়বে আর খামারে কাজ করে নিজেই তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে। এর পুরনো সব ব্যক্তিগত জিনিষপত্র একটা পুঁটলিতে বেঁধে বাড়ি ত্যাগ করলো সে।
পুঁটলিতে ছিলো,---তার কিছু কাপড়-চোপড়, একখানা পবিত্র বাইবেল আর তার সেই প্রিয় পিস্তলটি যেটা তার অনেক সাধের ধন।।
দেখা গেলো, তিন মাইল দূরে এক-কামরাবিশিষ্ট ইস্কুল ঘরে সে যা শিখেছে তার চেয়ে অনেক বেশি শিখেছে সেই খামারবাড়ির গোছানো বৈঠকখানায়। সেই বৈঠকখানায় মোটে তিনটে বই ছিলো—একটা বিরাট পুরনো পারিবারিক বাইবেল, একটা ঝুলানো পঞ্জিকা, একখন্ড মোটা এনসাইক্লোপিডিয়া।—-নাহ, এটা নতুন এনসাইক্লোপিডিয়া বা বিশ্বকোষ নয়। (The Copendium of Knowledge) তবে সংক্ষিপ্তসারটি ছিলো পুরনো কালের একটি “বিশ্বকোষ”। পাক-প্রণালী, বোনার নকশা, গেঁটে বাত, হাত-পা কাটার গৃহ-চিকিৎসা, এক রকম ফলের রস দিয়ে চুল কোঁকড়ানোর নিয়মাবলী ইত্যাদি টুকিটাকি খবরে ভর্তি ছিলো ওটা। তবে তখনকার জানা বৈজ্ঞানিক তথ্যাদির উপর লিখিত অনেক রচনাও তাতে ছিলো। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এ বইটাতে যেনো ফ্রাঙ্কলিনের বিদ্যুতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা', রবার্ট ফুল্টনের নতুন বাষ্প জাহাজ' এবং বাষ্প’শকট নামের একটা বস্তু তৈরীর সর্বশেষ প্রচেষ্টা সম্পর্কে আলোচনাও ছিলো। সে যুগে মানে, যখন বিশ্বকোষটি প্রকাশিত হয়েছিল, তখন সেটি পুরোদস্তুর মহান কিছু। কোন্ জিনিস ঠিক কিভাবে কাজ করে তা জানা, বোঝা এবং তা দেখার প্রতি স্যামের অত্যাধিক আগ্রহ ছিলো। চাই সে তার অবসর সময়ে বিশ্বকোষের সংক্ষিপ্তসারের বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধগুলো চষে বেড়াতে লাগলো। সে সাধারণতঃ তার সন্ধ্যার কাজ শেষে রান্নাঘরের চুল্লীর আলোয় বইটা নিয়ে পড়াশোনা করতো প্রতিরাতে। দিনের বেলায় তার বড়ো একটা অবসর মিলতো না। সকালবেলা ইস্কুলের দিকে দৌড়ে যাবার পূর্বেও তাকে জ্বালানী কাঠ কাটতে, গাই দোয়াতে ও গরুগুলোকে খাওয়ার পানি দিতে হতো। ইকুল থেকে ফেরার সাথে-সাথে আবার গাই দোয়ানোর সময় হয়ে পড়তো। তাছাড়া, তাকে বাড়ির চারদিকে বেড়া ঠিক করতে কিংবা চাষীর ইচ্ছানুযায়ী অন্য যে কোনো অনির্ধারিত কঠিন-কঠিন কাজও করতে হতো।
চাষী ভদ্রলোকের স্থির বিশ্বাস ছিল যে,—“অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। তাই তিনি স্যামের এই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহকে উৎসাহ দিয়ে খুশি হতেন। তার কাজ-শেষে ভালো কোনো কিছুতে স্যাম ব্যস্ত থাকুক, তিনি তা দেখতে চাইতেন। তাই তিনি স্যামকে তাঁর কারখানায় প্রয়োজনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্যে অনুমতি দিলেন। টুকটাক কাজ করার ব্যাপারে কারখানায় যন্ত্র বা জিনিসপত্রের অভাব ছিলো না। খামারের প্রায় সব জিনিসই তাকে নিজ হাতেই তৈরি করতে হতো। তখনকার দিনে যে কোনো চাষীকে একাধারে কাঠমিস্ত্রী, কর্মকার, মিলের মেরামতকারী, চর্মকার, এমন কি নিজ ব্যবহারের জন্যে বন্দুক প্রস্তুত এবং অন্যান্য অনেক কিছু করতে হতো।
এক সন্ধ্যায় সংক্ষিপ্তসার বিশ্বকোষটি পড়তে-পড়তে স্যাম একটা বিষয় আবিষ্কার করে ফেললো। বন্দুকের গুলীর পাউডারের প্যাকেট এর উপর লিখিত একটি বিশদ নিবন্ধের খোঁজ পেলো সে। তখনই তার পিস্তলের কথাটা আবার স্মরণ হলো। দোতলায় তার বিছানার বালিশের নিচে ওটা এতোদিন রাখা ছিলো। তার মায়ের কাছে যে প্রতিজ্ঞা সে করেছিলো, স্যাম তখনো পর্যন্ত তা রক্ষা করছিলো এবং সে পর্যন্ত বন্দুক ছোঁড়ার ব্যাপারে সে কখনো কোনো রকম চেষ্টা করেনি। কিন্তু বন্দুকের গুলীর পাউডারের উপর লেখা রচনাটি দেখার পরই সে মনে করে বসলো--হ্যা, এবার আমি আর ছোটোটি নেই, এবার আমার অস্ত্র ব্যবহারের সময় হয়েছে। নিজে গুলীর পাউডার তৈরি করার মতো যদি তার বয়স হয়ে থাকে, তবে তার সদ্ব্যবহার করার মতো বয়সও তার হয়েছে। এটাকেই সে মনে করলো, সে এখন বড়ো হয়েছে। নিবন্ধ পাঠ করে তাতে বর্ণিত গন্ধক, কাঠ-কয়লা আর সোড়া দিয়ে গুলীর পাউডার তৈরি হয়। চাষী-বউ গন্ধক আর গুড় মিলিয়ে একরকম গরমকালীন টনিক তৈরির কাজে গন্ধক ব্যবহার করতেন। রান্নাঘর থেকে স্যাম তার কিছুটা চেয়ে নিলো। জঙ্গলে গিয়ে শুকনো গাছের ডাল পুড়িয়ে সে নিজেই কাঠ-কয়লা তৈরি করলো। রাস্তার ধারের মুদী দোকান থেকে কিছু সোড়া কেনার মতো পয়সা তার ছিলো। তারপর বিশ্বকোষ-এর সংক্ষিপ্তসারের ফর্মুলাটা মুখস্থ করে জঙ্গলে গিয়ে নিভৃতে বসে জিনিসগুলো মিশিয়ে ফেললো সে। ঠিক বইয়ের কথা মতো, একটা ঘর্ষণ লাগার সঙ্গে-সঙ্গেই গুলীর পাউডার সশব্দে পুরো বনাঞ্চলটা বিদীর্ণ করলো।
এখন স্যাম তার ঘোড়া-পিস্তলটা ছোড়ার জন্য মনে মনে তৈরি হয়ে রইলো। এ পরীক্ষাকার্য তার মনিব চাষী ভদ্রলোক অনুমোদন করবেন কিনা, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ না হতে পেরে স্যাম স্থির করলো যে, সে এক রোববার ছুটির দিনের বিকেলে চেষ্টা করবে পিস্তলটা ব্যবহারের। তখন তার কোনো কাজ থাকবে না এবং পাহাড়ের দূর আড়ালে যেতে তার অসুবিধেও হবে না। সেখানে দূর পাহাড়ে তাকে কেউ দেখতেও পাবে না, কী হচ্ছে।
অবশেষে স্যামের বহু কাঙিক্ষত রোববার এলো। ঘোড়া-পিস্তলটাকে তেল দিয়ে ঠিক করে রাখলো সে। গির্জায় সকালের প্রার্থনার সময় স্যাম ছটফট করতে লাগলো এবং রোববার দুপুরের খাবারটাও যেনো শেষ হতে চায় না। মনে-মনে সে অস্থির হয়ে পড়লো খুব।
চাষী-গিন্নি স্যামের এমন অস্থিরতা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন,-“বাবা, তোমার কি হয়েছে? আজ কি তোমার খিদেও লাগেনি? নাকি, তোমার শরীর খারাপ? টেবিলের এপাশ থেকে একখন্ড মুরগীর রোস্ট তিনি স্যামের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। স্যাম বিনীতভাবেই বিড়বিড় করে কি যেনো বলে তার খাওয়া খেতে শুরু করলো। মুখখানা এমন যেনো তেতো কিছু কুইনাইন ট্যাবলেট গিলছে।
অবশেষে নিজের ইচ্ছে মতো বাড়ির বাইরে বেরুনোর সুযোগ ও অবসর পেলো, সে চুপিসারে সে দোতলায় তার রুমে ঢুকে সার্টের নিচে পিস্তলটা লুকিয়ে ফেললো।
তারপর বাড়ি থেকে পা টিপে টিপে বের হয়ে পাহাড়ের দিকে চললো সে। এক সময় তার মনে হলো সে বাড়ি থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছে। এবং তখনি সেখানে বসেই খানিকটা গুলীর পাউডার তৈরি করে পিস্তলে ভরতে শুরু করে দিলো খুব দ্রুততার সাথে। প্রথমে স্যাম পিস্তলের নলে খানিকটা গুড়ো পাউডার ঢেলে দিলো। তারপর এক টুকরো চর্বি-মাখানো কাপড় দিয়ে মোড়া একটা ‘পিস্তলবল’ সে ঐ নলে গুড়ো পাউডার এর উপর ফেলে দিলো। বুড়ো আঙুল দিয়ে হ্যামারটা পেছনের দিকে টেনে স্যাম তামার ছোটো প্রাইমার ক্যাপটি যায়গা মতো বসিয়ে দিলো। হ্যামারটা প্রাইমার ক্যাপটির উপর আঘাত করলে তাতে যে স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হবে তাতে গুলীর পাউডারে আগুন ধরবে। স্যার ভাবলো,-এর ফলে যে বিস্ফোরণ হবে তাতে পিস্তলবল ছুটে বেরিয়ে যাবে সামনের দিকে।
দুরুদুরু হৃদয়ে হলেও পিস্তলটা তুলে নিয়ে হাত শক্ত করে সে এক চোখ বন্ধ করে দূরের একটা ‘ওক গাছের ডালকে লক্ষ্য হিসেবে স্থির করলো। তারপর ঘোড়া টেনে গুলী ছুঁড়লো সে। এক প্রচন্ড গর্জনের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তার কান ঝালাপালা করে ফেললো মুহূর্তে।
স্যাম এতো উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলো যে, একটা ঘোড়া-পিস্তলের আওয়াজ মাইলকে-মাইল দূরে থেকেও শুনতে পাওয়া যায়, সে কথা সে একেবারেই ভুলে গিয়েছিলো। সে এটাও ভুলে গিয়েছিলো যে, চাষী ভদ্রলোক গোঁড়া ধার্মিক বা পিউরিটান। রোববারে-হাসি, চিৎকার, লাফালাফি, দৌড়াদৌড়ি কিংবা কোনো অসঙ্গত আচরণ তাঁর ভীষণ অপছন্দ। বন্দুকের গুলীর কথা তো মোটে উঠতেই পারে না। কিন্তু এখন আরতো কোনো উপায় নেই। স্যাম এক মুহূর্ত ইতস্ততঃ করে সার্টের একটা কোণ টেনে টুকরো করে ছিড়ে ফেললো। তারপর ওটা দিয়ে পিস্তলটা সে ঢেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি একটা মরা ওক গাছের গর্তে ওটাকে লুকিয়ে রাখলো। তারপর দৌড়ে খামারবাড়ির দিকে ছুটলো।।
এর মিনিট কয়েক পরে স্যামের খোজে চাষী ভদ্রলোক বৈঠকখানায় এলেন। তিনি জানতে চাইছিলেন, ছেলেটি বিকট একটা বজ্রধ্বনি শুনেছে কিনা। আকাশে কোনো মেঘ ছিলো না; দিনটা কতো সুন্দর মনে হয়েছিলো চাষীর কাছে, কিন্তু এ শব্দ কিসের আলামত? বাড়িতে বৈঠকখানায় জানালার ধারে চুপ করে বসেছিলো স্যাম- হাতে তার বাইবেল। ভীষণ রকম মশগুল সে বাইবেলে আর মুখে অনুতাপের চিহ্ন। পবিত্র গ্রন্থের প্রতি পবিত্র এই দিনে ছেলেটির এমন ধ্যানমগ্ন অনুরাগে মুগ্ধ হয়ে চাষী কোনো কথা না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন নিঃশব্দে।
খামারে তার কাজের মেয়াদকাল শেষ করে বাড়ি যাবার সময় না হওয়া পর্যন্ত স্যাম ওক গাছের গর্ত থেকে পিস্তলটা বের করতে সাহস করেনি আর। এ সময়ের মধ্যে সরল, সৎ ছেলেটির উপর চাষী দম্পতির মায়া ধরে গেছে এবং তাকে মেয়াদ শেষে বিদায় নিতে দেখে তারা খুবই মর্মাহত হলেন। তাদের হারানোর ব্যথা বালক স্যামের মনকেও ছুঁয়ে গেলো। তাই সে বাড়ি ফেরার সময় আবার বেড়াতে আসবে বলে কথা দিয়েছিলো খামার মালিককে। ওদিকে তার পিতার রেশমের মিল দেখার জন্যে সে আগ্রহে অধীর হয়ে উঠেছিলো। এর আগে সে কোনো উৎপাদনের কারখানা দেখেনি। আর আজ নিজেদের মিলেই নাড়াচাড়া করার মতো নানান জাতের কতো রকম যন্ত্রপাতি থাকবে, ভাবতেই তার আনন্দ হলো প্রচুর।
অবশ্য বালক স্যামের হতাশ হবার কোনো কারণ ছিলো না। মিলটা যেনো যন্ত্রপাতির যাদুঘর—স্বর্গরাজ্য। ঘূর্ণায়মান তাঁত আর মাকুর ঠকঠকিতে মিলটা সরগরম। তাতে খুঁচরো নানা মেরামত ও যান্ত্রিক রদবদল লেগেই আছে। স্যাম তো সাহায্যের জন্য এক পা এগিয়েই আছে মনে-প্রাণে। শুধু বাবাকে বলতেই যা ভয়। অনেক সময় মনে হতো, কোনো একটা যন্ত্র নষ্ট হবার অপেক্ষায়ই যেনো স্যাম দাড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু এতো সব কিছুর পরেও স্যামের মনের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিলো, মিলের ক্ষুদ্র ল্যাবরেটরী। ওখানটায় রেশম ব্লীচ করে রঙ দেয়া হতো। ল্যাবরেটরীটা রাসায়নিক দ্রব্যে ভর্তি ছিলো আর ছিলো সাধারণ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। স্যামের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানোর জন্যে যা কিছুর প্রয়োজন ঠিক যেনো তাই ওখানটায় ছিলো। এই ল্যাবরেটরীর ভারপ্রাপ্ত রসায়নবিদ ছিলেন এক যুবক তার নাম উইলিয়াম স্মিথ। স্যামকে তিনি ভীষণ পছন্দ করলেন। তার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসায় তিনি স্যামকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তবে, স্যাম খুব বেশি রকম উৎসাহী হয়ে গোটা কারখানাটাই আবার উড়িয়ে দেয়—এসব ভেবে রসায়নবিদকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হয়েছিলো। তখনো স্যামুয়েল তার নিজের গুলীর পাউডার তৈরি করছিলো। একটি সর্বাঙ্গ সুন্দর বিস্ফোরণের চেয়ে অন্য আর কিছু সে পছন্দ করতো বলে মনে হয় না।
চিরকাল কারখানায় থাকতে পারলে স্যাম খুশি হতো। তার বাবার কিন্তু অন্য রকম ইচ্ছে ছিলো। ক্রিস্টোফারের ব্যবসায়ে সুদিন দেখা দিতে শুরু করেছে। তাই স্যামের প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়ার প্রতি তার আগ্রহ দেখা দিলো। ১৪ বছর বয়সে তাকে নিকটবর্তী আমহার্স্ট শহরের এক একাডেমীতে ভর্তি করে দেয়া হলো। কিন্তু বিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করতে অনিচ্ছুক হওয়ায়, স্যাম সাথে করে কিছু-কিছু রাসায়নিক দ্রব্য ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে নিলো। তা দিয়ে সে একাডেমীতে থাকার ছোটো কামরায় একটা ক্ষুদে ল্যাবরেটরী তৈরি করে ফেললো। নিজের তৈরি আতশবাতি সহপাঠিদের মাঝে বিলিয়ে অচিরেই সে তাদের স্বীকৃতি পেয়ে গেলো।
এসব পরীক্ষা চালানোর ফলে যে হট্টগোল ও আওয়াজ সৃষ্টি হলে তাতে সে তার একাডেমীর শিক্ষকদের কাছে বিরাগভাজন হলো।
একাডেমীতে স্যামের তখনো খুব বেশিদিন হয়নি। এরই মধ্যে সে তার প্রথম মৌলিক আবিষ্কারের চিন্তা স্থির করে ফেললো। বাবার কারখানায় ফিরে গিয়ে সে বৈদ্যুতিক ব্যাটারি তৈরি করা শিখে ফেলেছে। পরে সে বুঝতে পারলো যে,—বিদ্যুৎ দিয়ে গুলীর পাউডারে বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব। এ বিষয়ে সে কিছুদিন ধরেই চিন্তা করছিলো। তার ধারণা হলো, তার এই আবিষ্কার কোনো ভালো কাজে প্রয়োগ করার নিশ্চয়ই ভিন্ন পথ আছে, এবং সে পথ তাকেই খুঁজে বের করতে হবে।
দিনেদিনে ধীরে-ধীরে তার মাথায় একটা নতুন ধারণার সৃষ্টি হলো। সারা জীবন ধরে সে ১৮১২ সালের যুদ্ধের গল্প শুনে এসেছে। বিশেষতঃ যে সব বৃটিশ যুজাহাজ অ্যামেরিকার উপকূল ভাগ আক্রমণ করেছে তাদের সমস্ত কথা সে শুনেছে। ফ্রান্সিস স্কট কী’র’ তারকা-খচিত পতাকায় বর্ণিত বল্টিমোরের ফোর্ট ম্যাকহেনরীর উপর কামানের গোলাবর্ষণ স্যামের জন্মের মাস খানিকের মধ্যকার এক আলোচিত ও আলোড়িত ঘটনা। জানা যায়, যদি সব শত্রু জাহাজকে পানি থেকে উড়িয়ে দেবার কোনো উপায় থাকতো, তাহলে হয়তো অ্যামেরিকা আরো আগে যুদ্ধে জয়লাভ করতে সক্ষম হতো। স্যাম চিন্তা করলো, বিদ্যুতের সঙ্গে গুলীর পাউডার! ওখানেই উত্তর লুকিয়ে রয়েছে। আমাকে দেখতে হবে আরো, জানতেও হবে আরো।।
কিন্তু এই ধারণাকে পরীক্ষা করার জন্যে তাকে একাডেমীর ছুটি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। সেই গ্রীষ্মে ‘ওয়েআর’-এ অবস্থিত রেশমের কারখানায় ফিরে সে গ্রামের মাঠে বিরাট দুটি খুঁটির সাথে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলো। তাতে লেখা ছিলোঃ -
স্যামুয়েল কোস্ট আগামী ৪ঠা জুলাই, ১৮২৯ ওয়েআরের পুকুরে একটা নৌকোকে শুন্যে উড়িয়ে দেবে সাইনবোর্ডের অভিনব ঘোষণা শহরে একটা বড়ো আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো-- “গুলীর পাউডার শুকনো রাখো”, এ উপদেশ সবারই জানা কথা। ভেজা পাউডারের বিস্ফোরণ হতে পারে না! যদি হয়ও, তাহলেও পানির নিচে কেমন করে তাতে অগ্নি সংযোগ করা হবে? তরুণ আবিষ্কারক এমন কি আশ্চর্য খেলা দেখাবে, তা দেখার জন্যে শহরের প্রায় অধিকাংশ বাসিন্দা ৪ঠা জুলাই তারিখে এসে নির্দিষ্ট স্থানে হাজির হলো।
স্যাম দর্শকবৃন্দের জন্য তৈরি হয়েই ছিলো। আগের রাতে সে একটা ওয়াটার প্রুফ পাত্রে খুব শক্তিশালী গুলীর পাউডার ভরে পুকুরের তলদেশে রেখে দিলো। পারের জঙ্গলে সে লুকিয়ে রেখেছিলো একটা বিদ্যুতায়িত ব্যাটারী। বিটুমিন বা পিচ দিয়ে কালো করা তার দিয়ে সে পানির নিচের পাউডার পাত্রেও ব্যাটারি সংযুক্ত করে দিলো, কারণ তারের উপর কোনো পানি ভেদী প্রলেপ না দিলে আর্থিং হয়ে যাবে। সমবেত লোক পুকুরের মাঝখানে একটা নৌকো ভাসতে দেখা ছাড়া আর কিছুই দেখতে বা বুঝতে পারলো না। জঙ্গলের মধ্যে স্যাম তার ব্যাটারি ঠিকঠাক করছিলো বসে-বসে।
সব কিছু ঠিকমতো করা হয়েছে, ভেবেচিন্তে স্যাম এ ব্যাপারে পুরো নিশ্চিত হলো। কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারেই তার ভুল হয়ে গিয়েছিলো। নৌকোটা বেঁধে রাখতে ভুলে গিয়েছিলো সে। শহরের সবাই ভীষণ কৌতুহল এবং উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ জোর বাতাস এলো। তার ফলে পাউডার পাত্রের উপর থেকে নৌকোটা সরে গেলো। স্যাম তা লক্ষ্য করেনি। নিশ্চিত বিশ্বাসে সে ব্যাটারিতে নেগেটিভ-পজেটিভ সংযোগ দিলো। পানির নিচে একটা ভক ভক আওয়াজের বিস্ফোরণ ঘটলো। কাদামাটি আর পানি শূন্যে উখিত হলো। বেশীর ভাগ দর্শকেরা ছুটির দিনের ভালো পোশাকে সজ্জিত হয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়েছিলো। হতভম্ব দর্শকদের সেই উথিত কাদামাটি আর পানি ভিজিয়ে একাকার করে ফেললো। নৌকোটা তখন বিস্ফোরণ স্থল থেকে অনেকটা নিরাপদ দূরত্বে। তাই ওটা তখন ঢেউয়ের দোলায় শুধুই দুলতে শুরু করেছিলো। যা হওয়ার কথা, তা হলো না।
কিন্তু খুশি মনে স্যাম জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। তার ধারণা ছিলো, দর্শকবৃন্দের কাছ থেকে হাততালি পাবার---কিন্তু তার কপালে জুটলো,-চিৎকার, তিরস্কার আর হুমকি। কে একজন চিৎকার করে বলে উঠলো, 'এই উঁচড়েপাকা ছেলে-তোমাকে এখন আচ্ছা চুবুনি দেয়া দরকার এই কর্দমাক্ত পুকুরে।
৪ঠা জুলাই-এর উত্তেজনা অব্যাহত রাখার জন্য মাথা-গরম এক দল লোক স্যামের চারপাশে ভিড় করে তাকে পানির দিকে ঠেলতে শুরু করে দিলো। স্যাম চিৎকার করে বলে উঠলো, “বিস্ফোরণ হয়েছে এটা সত্যি কিনা? পানির নিচে এমনি বিস্ফোরণ এর আগে আপনারা কখনো দেখেছেন, বলুন দেখেছেন?”
জনতার মধ্য থেকেই একটা উচ্চকণ্ঠ ঠিক সময় মতো এগিয়ে এলো এবং তাকে রক্ষা করলো, ছেলেটি ঠিকই বলছে। ঠিক তার দেয়া কথা মতো বিস্ফোরণ হয়েছে। নৌকোটা বাতাসে সরে গেছে সেটা স্যামের অপরাধ নয়। যদি ওটা সরে না যেতো, তাহলে ওটা ফেটে চৌচির হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়তো। এবার সবাই বুঝতে পেরেছেন বলেই আমার বিশ্বাস। আমার মতে, স্যামের আবিস্কার খুবই সার্থক হয়েছে। দর্শকবৃন্দ এবার তা স্বীকার করতে বাধ্য হলো! কাদা লাগার জন্যে স্যাম ক্ষমা চাইলো বিনীতভাবে। পানিতে চুবুনি দেওয়ার পরিবর্তে এবার দর্শকদের সবাই তাকে অভিনন্দন জানালো। –‘পানির নিচে বিস্ফোরণ! এটা সে কি কিভাবে ঘটালো সবাই তা জানতে চাইলো। কিন্তু ভবিষ্যত বিজ্ঞানী, গবেষণার নিরাপত্তার কথা ভেবে তা প্রকাশ করতে রাজী হলো না।
সেই শরতে ছুটির কাটিয়ে—-স্কুলে ফিরে তার সহপাঠীদের উপকারার্থ সে তার পানির নিচের বিস্ফোরণের প্রদর্শনী করলো। প্রধান শিক্ষক রেভারেন্ড অয়েল ওয়াশবার্ন ভাবলেন,—পানির নিচের বিস্ফোরণ আর হাতে তৈরী আতশবাজি—এটা কিছুটা বাড়াবাড়ি মনে হলো তার। তাই তিনি স্কুলের সম্পত্তি বা কম্পাউণ্ডের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটানোর ব্যাপারে তাকে সাবধান করে দিলেন।
শিক্ষক রেভারেন্ড বললেন,-স্যামুয়েল, তোমার লেখাপড়ায় মন দেয়া উচিত। বিস্ফোরণ সম্পর্কে হয়তো তুমি পারদর্শী হতে পারো; কিন্তু ভালো ছাত্র হিসেবে গৌরব করার মতো পৃথিবীতে কিছুই নেই।
কথাটা সত্যি এবং স্যামকে তা স্বীকার করতে হলো। তার পাঠ্য ল্যাটিন ভাষা, ছন্দ প্রকরণ, নৈতিক দর্শন ও বক্তৃতা তার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। সৌভাগ্যবশতঃ একাডেমিতে বিজ্ঞানের এক কোর্স ছিলো। তাতেই তার খারাপ ফলের কিছুটা ক্ষতিপূরণ হতো। অঙ্ক এবং নৌ-বিদ্যাতে সে ভালো ফল করতো। এ দুটো বিষয় সাগরযাত্রীর দেশ নিউ ইংলন্ডের সব স্কুলেই পড়ানো হতো বাধ্যতামূলকভাবে। বস্তুতঃপক্ষে, সমুদ্রে যাবার আকাঙ্ক্ষা তার মনে ধীরে-ধীরে দানা বাঁধছিলো। ওটা তার কাছে উত্তেজনাপূর্ণ রোমাঞ্চিত এ্যাডভেঞ্চারাস জীবনরূপে ধরা দিয়েছিলো। এদিকে আমহার্স্টে সত্যি বলতে কি, তার আর ভালো লাগছিলো না। একবার সে তার বাবার কাছে লেখা এক চিঠিতে কথাটা লিখেছিলো। কিন্তু বাবা ক্রিস্টোফার স্যামকে স্কুল থেকে তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অবশ্যই শেষ করতে হবে বলে কড়াকড়ি শর্ত এবং চাপ দিয়ে চিঠির উত্তর দিলেন।
এতো সব করেও কিন্তু আজকের এই মহান বিজ্ঞানীর শিক্ষা সমাপ্ত করার সুযোগ হয়নি। তার শিক্ষাজীবন অকস্মাৎ এক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এক সন্ধ্যায় স্যাম তার ল্যাবরেটরির রুমে কাজ করার সময় সামান্য ভুল করে ফেলে। ফলে হলো কী, ইটের তৈরী দোতলা ইস্কুল-দালানটা এক ক্ষুব্ধ গর্জনে কেঁপে উঠলো। শিক্ষক-ছাত্র সবাই স্যামের কোঠায় দৌড়ে এসে দেখতে পেলো, সে বিছানার উপর হতভম্ব হয়ে বসে আছে আর সমস্ত শরীরের রক্ত যেনো তার মুখে এসে জমা হয়েছে। সে চোট পায়নি, কিন্তু কামরাটার অবস্থা শোচনীয়। প্রধান শিক্ষক রেভারেন্ড ওয়াশবার্ন স্যামের যন্ত্রপাতির পুড়ে যাওয়া অংশসহ সব কিছুই বাজেয়াপ্ত করলেন। কিছু সিদ্ধান্ত না নেয়া পর্যন্ত ইস্কুলের পরিচালনা পরিষদ এবং বোর্ডকমিটি পরের দিন মিলিত হয়ে তার বিষয়ে কোনো উপযুক্ত কিছু সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত স্যামের রুমের বাইরে যাওয়া বন্ধ করেও নির্দেশ জারী করেছিলেন।
৩ টি পর্বের ১ম পর্ব শেষ হল।
২য় পর্ব পড়তে ক্লিক করুনঃ বিজ্ঞানী স্যামুয়েল কোল্ট এর রিভলভার উদ্ভাবনের দু:সাহসিক কাহিনী - story of the invention of revolver by Samuel Colt - part 2 of 3
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন